গল্প অনেক নায়ক এক।

৬০ বছরের বৃদ্ধ বাবার মাথায় একের পর এক বস্তা তুলে দিচ্ছে ফাহাদ।ইচ্ছা করছে এক সাথে দুইটা করে বস্তা তুলে দিতে ।ক্লান্ত শরীল নিয়ে বৃদ্ধ বাবা বসে পরতেই ফাহাদয়ের মেজাজ তীব্র আকার ধারন করল।কারন ঐদিকে রাফি তার জন্য জুয়ার কোর্ডে বসে অপেক্ষা করছে।কিন্ত বস্তা আনলোডের জন্য ফাহাদ যেতে পারছেনা।
বস্তা আনলোডের কাজ ফাহাদ এর বাবা একাই করে,ফাহাদ আজ প্রথম আসলো।ফাহাদ এর
বাবার সাথের লোকটা আজ কাজে আসেনি তাই।সে আসলে হয়ত বাবা আর সে দুই জনে ভাগে এই বস্তা গুলা গাড়ি থেকে আনলোড করত।কিন্ত আজ সে লোকটা অসুস্থ থাকার কারণে আসতে পারেনি। তাই ফাহাদ এর বাবা ফাহাদকে সাথে নিয়ে এসেছে।কারন একদিনের কাজ বন্ধ হলে ঘরের চুলার আগুনের তাপে খালি পাতিল পোড়ানো ছাড়া ফাহাদের মায়ের আর কোন উপায় থাকবে না।
কিন্ত ফাহাদ এসব পাতিলের খবর কোনদিন নেয়নি।এক বেলা খাই ত দুই বেলা না খেলেও চলে।তার তো শুধু ঐ দিনে ৫০ টাকার গাজা আর জোয়া খেলার জন্য এক দের'শ টাকা হলেই হয়ে যায়।
বিরক্ত নিয়ে তারাতাড়ি কাজ শেষ করার জন্য বাবাকে বসে পরতে দেখে ফাহাদ,নিজেই একটা বস্তা মাথায় তুলে দুই পা বাড়াতেই ঘাড়ের সব থেকে তেড়া রকটা কট করে শব্দ করল।
আর এদিকে বস্তার ভারে ঘাড়টা নিচের দিকে গেধে যাওয়ার উপক্রম।চোখ দিয়ে নিমিশেই পানি ঝড়তে লাগল দূর থেকে ফাহাদের বাবা তা দেখে দৌড়ে এসে ঘাড় থেকে বস্তাটা ধাক্কা দিয়ে মাটিতে ফেলে জিজ্ঞাস করল,বাবা ব্যথা পাইছিস?তুই কেন বস্তা মাথায় নিতে গেলি?
এসব কথা বলতে বলতে বৃদ্ধ বাবার কুচকানো চামড়া চোখের পানিতে ভিজে গেছে।বৃদ্ধ মানুষ টার এই চোখের পানি ফাহাদ এর ভিতরটা দুমরে মুচড়ে দিচ্ছিলো।দুই চোখের পানি যেন ফাহাদকে ও ভিজাতে চাচ্ছে।এদিকে ফাহাদ বাবা সাথে সাথে এদিক ঐদিক ছুটাছুটি শুর করে দিল।দৌড়ে গিয়ে মদি দোকান থেকে আইসক্রিম এনে ফাহাদ এর ঘারে চেপে ধরল।বৃদ্ধ মানুষটা এই বয়সে ফুসলে ফুসলে কাঁদছে আলমের মত একটা অপদার্থ ছেলের জন্য তা ভাবতেই বুকের ভিতরটা হাহাকার করে উঠল।
দুই হাত দিয়ে বাবার চোখের পানি মুছতে গিয়ে বাবার পায়ের দিকে নজর পরল ফাহাদের। দেখতে পেলো তার বাবার পায়ের আংগুল ফেটে তাজা রক্ত বের হচ্ছে।তারাতাড়ি হাত দিয়ে পা চেপে ধরে বাবাকে জিজ্ঞেস করলো,,,,
একটু আগেও ত পা ঠিক ছিল এখন পা টা কাটলে কিভাবে?এতক্ষণ কাঁদতে থাকা মানুষ টা ছেলের মুখে এমন কথা শুনে,একটা মুচকি হাসি দিয়ে বলল তোর জন্য বরফ আনার সময় কিসে যেন উষ্ঠা লাগছিল।তখন হয়ত কেটে গেছে।
বাবার মুখে এমন কথা শুনে ফাহাদ আর নিজেকে ঠিক রাখতে পারলোনা।নিজের পায়ের নখ উঠে অঝোরে রক্ত পরছে কিন্ত সে তা বুজতেই পারেনি।ছেলে ঘারে ব্যথা পাইছে এই ভয়ে বাচ্চাদের মত কাঁদছে।ফাহাদ আর নিজেকে সামলাতে পারলোনা। বাবাকে জরিয়ে ধরে হাও মাও করে কাঁদতে লাগলো।কাঁদতে কাঁদতে বাবাকে বললো,বাবা গো রাতে ঘুমাইছ কিনা,দুপুরে খাইছ কিনা, তোমার কিছু লাগবে কিনা,কিছুই ত কোন দিন ও জিজ্ঞাস করিনি।তবু কেন এই অপদার্থ ছেলের জন্য এই বয়সে কাঁদছো বাবা?
বাবাগো আমি ত ঘারে ব্যথা পাইনি,ব্যথা পাইছি কলিজায়,যে কলিজাটা নেশার কালো ধুয়ায় পুড়ে ছাই হয়ে গেছে।যে নেশা বাবা মা কি তা আমাকে ভুলিয়ে দিয়েছিল।বাবা বস্তা টা মাথায় নিয়ে আমি এটা ভেবে চোখ দিয়ে পানি ছেরে দিছিলাম আমার মত ২২ বছরের ছেলে এই বস্তা মাথায় নিয়ে মনে হচ্ছিল ঘার টা ভেংগে যাবে। সেখানে আমি এতক্ষন কত বড় কুলাংগার হয়ে এত ভারি বস্তাটা তোমার মাথায় তুলে দিচ্ছিলাম।বাবা তুমি যখন কান্ত শরিল নিয়ে বসে পড়লে।আমি তখন এটা ভাবিনি যে বাবার ঘাম টা মুছে পাশে দাঁড়িয়ে একটু বাতাস করি।বাবা আমার মাথায় তো তখন বাংলাদেশের খেলায় প্রতি বলে বাজি ধরে টাকা জিতার চিন্তা ঘুরছিল।যদি এই বস্তা টা আরো আগে মাথায় নিতাম,তাহলে এই অপদার্থ ছেলেটা হয়ত গাজার ধোয়ায় সুখ না খুজে তোমার পায়ের কাছে সুখ খুজে পেত। ফাহাদ এর এই কান্না জরিত কথা গুলা বাবার কলিজায় গিয়ে আঘাত করছে।তাই ফাহাদকে এত শক্ত করে জরিয়ে ধরছে যে নিজের ভিতরে নিয়ে যাবে।বাপ ছেলে রাস্তায় বসে হাও মাও করে কাঁদছে।তা দেখে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা মানুষ গুলোর ও নিজেদের চোখের পানি ধরে রাখতে পারেনি।তাদের চোখের কোনেও জল গড়িয়ে পরছে।
বাবা যে কি জিনিস তা আজ বুঝতে পারলো ফাহাদ। নিজের মনকে নিজেই বললো অনেক হইছে এবার থেকে পরিবারের দায়িত্ব ফাহাদ ই নিবে।ফাহাদ বাবার চোখের পানি মুছে দিয়ে বললো..
বাবা তুমি দূরে গিয়ে বস আমি গাড়ি থেকে বস্তা আনলোড করব।ফাহাদের কথা কোন ভাবেই তার বাবা মানতে চাচ্ছিলোনা।পরে রাস্তার দারিয়ে থাকা সেই মানুষ গুলা চোখ মুছতে মুছতে বলল.. ভাই ওকে বস্তা মাথায় নিতে দেন।ওর নিজের পাঁয়ে দারানো দরকার। সবার জোরাজোরি তে ফাহাদ এর বাবা রাজি হলেও মন থেকে পুরোটা মেনে নিতে পারেনি।ফাহাদের মাথায় বস্তা তুলে দিয়ে পিছন থেকে বস্তার এক কোনা ধরে পিছে পিছে হাঁটছে ফাহাদের বৃদ্ধ বাবা।বাবার এই কান্ড দেখে ফাহাদ ভাবতে লাগলো,,
((যারা গল্প পড়তে পছন্দ করেন Fwrd বা Request দিয়ে এক্টিভ থাকুন))
হায়রে বাবা,২৪ বছরের ছেলের মাথায় বস্তা তুলে দিয়ে ও ব্যথা পাবার ভয়ে বস্তার পিছন ধরে রাখছে।আর ৬০ বছরের বৃদ্ধ বাবার মাথায় বস্তা তুলে দিয়ে দারিয়ে দারিয়ে জুয়ার কথা ভাবে। এটাই হয়ত বাপ ছেলের মাঝে পার্থক্য।বাবা যাতে বস্তা না ধরে তাই বুদ্ধি করে ফাহাদ তার বাবাকে বললো,, আমার জুতাটা দামি বস্তা টানতে গিয়ে ছিরে যাবে,তুমি তোমার জুতাটা আমাকে দিয়ে গাছের নিচে গিয়ে বস।বাবা কথাটা শুনে সাথে সাথে জুতাটা খুলে ফাহাদকে দিয়ে দিল ঠিকি কিন্ত বস্তার ধরা বন্ধ করল না।উওপ্ত বালিতে খালি পাঁয়ে হাটছে ফাহাদের বাবা,তবু এত করে বলা সত্ত্বেও বস্তার পিছন ধরা ছারছে না।
একটু পর পাঁয়ের তলায় খোচা লাগছে দেখে ফাহাদ জুতাটা হাতে নিয়ে দেখে চারপাশে সেলাই করা জুতাটা হার মানে নেয়ায় পরেও একের পর এক পেরেক গাথা হয়েছে তাতে।তার মধ্যে একটা পেরেক একটু উপরে উঠে আছে।
পেরেক গুলোর দিকে তাকাতেই ফাহাদ কিছুটা অবাক হলো। কারণ জুতাটার মধ্যে যে পেরেক গুলো রয়েছে, একটাও জুতার পেরেক না সব গুলা কাঠের দোকানের হাফ ইঞ্চি পেরেক।
অবাক দৃষ্টিতে বাবার দিকে তাকিয়ে বললো,,বাবা কোন মুচিকে দিয়ে জুতার পেরেক মারাইছো?এগুলো তো কাঠের পেরেক।
ফাহাদের কথা শুনে তার বাবা আবারও মুশকি হাসি দিয়ে বলল..
মুচি দিয়ে সেলাই করিনি রে,আমি কাঠের দোকান থেকে কয়টা পেরেক চেয়ে নিয়ে নিজেই মারছি।শুধু শুধু টাকা নষ্ট করে কি লাভ বল?
বাবার এই হাসি ঈদে নতুন জুতা কিনার জন্য বাবা মায়ের সাথে খারাপ আচরনের কথা মনে করিয়ে দিয়ে ফাহাদ এর কলিজায় আঘাত করল,ফাহাদ টান দিয়ে তার বাবার সেই পেরেক পিটানো হাত টা চুমু খেতে গিয়ে দেখে একের পর এক ঠোসায় পুরা হাতের তালু ক্ষন বৃক্ষত।
ফাহাদ আর নিজেকে কন্ট্রোল করতে পারলোনা। বাবার পা জরিয়ে ধরে কাঁদতে লাগলো। বাবা কাঁদতে কাঁদতে ফাহাদকে জিজ্ঞাস করল কাদিস কেন বোকা ছেলে?এগুলা কিছু না রে।এই সামান্য হাতে ফোসকা পরেছে।এমনিতেই ঠিক হয়ে যাবে।
ফাহাদ এর আজ নিজেরি গলা টিপে মারতে করতে ইচ্ছা করছে। চোখের পানি মুছে তারাতাড়ি বস্তা আনলোড করে বাবাকে বাড়িতে পাঠিয়ে দিলো ফাহাদ।তারপর মায়ের থেকে জুয়া খেলার জন্য আনা দেড়শো টাকার মধ্যে ১২০ টাকা দিয়ে এক জোড়া জুতা কিনলো বাবার জন্য।
তারপর আর ২০ টাকায় মায়ের জন্য হাত ব্যথা ও গেস্টিকের টেবলেট কিনলো।
সারা দিনের ক্লান্ত শরীর তার উপর প্রচন্ড ক্ষুদা নিয়ে পকেটের ১০ টাকা দিয়ে জিলাপী কিনে মুখে দিতে যাবে,এমন সময় ছোট বোনের মায়া ভরা মুখটা চোখের সামনে ভেসে উঠলো। পাগলিটা জিলাপী খেতে খুব পছন্দ করে।ফাহাদের আর খাওয়া হলোনা।জিলাপীর প্যাকেটটা হাতে নিয়ে বাসার দিকে হাঁটা শুরু করলো।
পকেটে থাকা ভাঙ্গাচুড়া ফোন টা আবার বেজে উঠল, দেখে রাফির ফোন।ফাহাদ রাফির কলটা কেটে দিয়ে নাম্বার টা ব্লক করে দিলো।আর মনে মনে বললো..রাফিরে আমি আলোর পথ খুজে পেয়েছি,তাই আমাকে আর তুই খারাপ কাজে খুজে পাবি না।
বাসার সামনে গিয়ে দরজায় টোকা দিতেই ফাহাদের ছোট বোন দরজা খুলে দিল।হাতে থাকা জিলাপীর প্যাকেটটা ওর হাতে দিতেই রাজ্য জয়ের হাসি দিয়ে বলল,ভাইয়া আমার জন্য জিলাপী,আনছিস।বোনটা জিলাপী হাতে নিয়ে একটু মুখে দিয়ে কাঁদতে লাগল।
-- কাঁদিস কেন পাগলি?
--জানিস ভাইয়া কত দিন ধরে জিলাপী খাই না।মাঝে মাঝে খুব ইচ্ছা করে,মার কাছে টাকা চাইতে গিয়ে যখন মনে পরত, মা টাকার অভাবে একটা ব্যথার ঔষধ কিনে না খেয়ে সারা রাত ব্যথায় ছটফট করে।তখন জিলাপী না খেয়েই পেট ভরে যেতো রে ভাইয়া।(কান্নাজরিত কন্ঠে সাদিয়া)
ছোট বোনের মুখে এমন কথা শুনে চোখের কোনে আবারো জ্বল গড়াতে লাগলো ফাহাদের।ফাহাদের চোখ মুছে দিতে দিতে মুচকি হাসি দিয়ে বলল.. আরে ভাইয়া কাদিস কেন?তোকে জিলাপীর ভাগ দিব একা একা খাব না।(সাদিয়া)
বোনের কথা শুনে মুচকি হেঁসে ঘরে ডুকে বাবার হাতে ১২০ টাকার জুতাটা দিতেই বাবা সে কি খুশি।৬০ বছরের বাবা তার জন্য তার ছেলে জুতা আনছে দেখে ৬ বছরের বাচ্চাদের মত জুতাটা বার বার উল্টে পাল্টে দেখছে আর ঘরের মধ্যেই জুতা পরে হাঁটা শুরু করে দিয়েছে।বাবার এমন কান্ড দেখে আলমের মা হাঁসতে হাঁসতেই চোখ মুচছে আচল দিয়ে।
ফাহাদ উপরের দিকে তাকিয়ে আল্লাহকে সরণ করে মনে মনে বললো,এ কেমন কান্না কাঁদাচ্ছো খোদা?যত কাঁদি ততই কলিজায় শান্তি লাগে।মায়ের হাতে ঔষধ গুলো দিয়ে ঘরের দিকে দৌড় দিল আলম""ওজু করে দুই রাকাত নফল নামাজ শেষ করে খোদার কাছে দুইটা হাত তুলে মোনাজাতে কাঁদতে কাঁদতে বলতে লাগলো...
""""ও মালিক,কাঁন্নায় যে এত মজা,আগে জানতাম না"""
#গল্প_কান্না
📝#ফারহান_ফাহাদ 🖋
কোন মন্তব্য নেই
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন